উৎপাদক ও রপ্তানীকারকের দেশে

Author: মোস্তাফা জব্বার, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রী, বাংলাদেশ

2018-03-15, Ananda Computers

দুটি মাইলফলক অর্জনের কথা বলার জন্যই এই অবতারণা। এক কথায় বলতে গেলে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তিকে সত্যিকারের ডিজিটাল যুগে স্থাপন করার জন্য এই দুটি মাইলফলক অর্জনের কোন তূলনা নেই। আমি কেবল ৯৮-৯৯ সালের বাজেটে কম্পিউটারের ওপর থেকে শুল্ক ও ভ্যাট তুলে নেবার ঘটনাটিকে এই দুটি অর্জনের কাছাকাছি বলে মনে করতে পারি। সালাম জানাই বাংলার স্বর্ণকন্যা শেখ হাসিনাকে, যার হাত ধরেই তিনটি মাইলফলক অর্জন পেলাম আমরা। নিজের কাছেও একটু শান্তি পাচ্ছি এই ভেবে যে তিনটি অর্জনের সাথেই আমি দারুনভাবে সম্পৃক্ত ছিলাম।

বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তিতে নিজের অবস্থান তিন দশক বা একত্রিশ বছরের বেশি সময় পার করছি। সেই ৮৭ সালের ২৮ এপ্রিল থেকে এখনও বহমান এই যাত্রার বাঁকে বাঁকে যেমনি আছে সুখ-দুঃখ তেমনি আছে জয় পরাজয়। কখনও হেসেছি, আবার কখনও  কেদেছি। পেছনের এই একত্রিশ বছরের দিকে তাকালে যেমনি বলা যাবে অর্জনের কথা, তেমনি বলা যাবে অর্জন করতে না পারার কথাও। আমার বড় সুবিধা হচ্ছে যে, আমি ভালটা, অর্জনটা বা বিজয়টাকে মনে রাখি। পরাজয়টা গায়ে মাখিনা। এসব মিলেইতো জীবন। মানুষ খুব ভাগ্যবান যে, সে তার কষ্টের কথা, বেদনার কথা বা পরাজয়ের কথা তেমনভাবে মনে রাখেনা। যদি খারাপটা মনে রাখতো তবে হয়তো তার সামনে চলা থেমে যেতো। বেশির ভাগ সময়েই মানুষ তার আনন্দ ও বিজয় এর কথাই মনে রাখে। আমিও তাই আনন্দের কথা বা সফলতার কথাগুলোই মনে রাখি। এই খাতে আমার নিজের কি অর্জন সেটি আমি গুছিয়ে বলতে পারবোনা। তবে একত্রিশ বছরে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে যার অন্তত দুয়েকটি প্রধান স্মৃতি এখানে তুলে ধরতে চাই। আমাদের নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তিবিদ, রাজনীতিক ও নীতি নির্ধারকগণ এই স্মৃতিচারণ থেকে কিছু না কিছু জানবেন সেই প্রত্যাশা আমার রয়েছে। স্মৃতিচারণ করলে স্মরণে পড়বে কম্পিউটার দিয়ে বাংলা পত্রিকা প্রকাশের কথা, প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস প্রতিষ্ঠার কথা, ডেস্কটপ প্রকাশনার বিপ্লবের কথা, জাতীয় নির্বাচনে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার, কম্পিউটারের ওপর থেকে শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহার, দেশব্যাপী কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, শিক্ষার ডিজিটাল রূপান্তরের লড়াই, ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারনা, দেশে ডিজিটাল যন্ত্র উৎপাদনের সুযোগ  তৈরি, দেশীয় সফটওয়্যার ও সেবা খাতের সুরক্ষা এবং সম্ভবত সর্বশেষটি দেশে ডিজিটাল যন্ত্র উৎপাদন ও ডিজিটাল পণ্য রপ্তানীতে নগদ সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থার কথা। স্মৃতিচারণটা পুরো হতো যদি সেই ৯৭ সালের কথাগুলো বলা যেতো যখন বাংলার স্বর্ণকন্যা শেখ হাসিনার হাত ধরে কম্পিউটারের ওপর থেকে সকল শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তটি নিতে পারার কথাগুলো বলতে পারতাম।  বিশ বছর আগের সেই কাহিনী অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। সেই কথা তাই অন্য সময়ে বলা যাবে। এবার প্রসঙ্গটি দুটি অর্জনেই সীমিত রাখতে চাই।

৬ আগস্ট ১৫: খুব পেছনের কথা নাই বলি। ২০১৫ সালের ৬ই আগষ্ট ডিজিটাল বাংলাদেশ টাস্কফোর্স-এর স্মৃতিটা ছোট করে স্মরণ করি। সেদিন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে ডিজিটাল বাংলাদেশ টাস্কফোর্স এর সভা অনুষ্ঠিত হয়। কোন পদবী ছাড়াই কেবলমাত্র আনন্দ কমপিউটার্সের মালিক হিসেবে সেই সভায় আমি আমন্ত্রণ পাই। আমি না ছিলাম বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সভাপতি না ছিলাম বেসিস এর সভাপতি। তবুও ব্যক্তি হিসেবেই আমি ঐ শীর্ষ তথ্যপ্রযুক্তি কমিটির সদস্যও হই। ধন্যবাদ তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগকে। সঙ্গতকারণেই আমি সেই কমিটির সভায় উপস্থিত ছিলাম। কোন সন্দেহ নাই সেটি আমার জন্য ছিলো একটি বিরাট সম্মান।  যদি পেছনের কথা মনে রাখি তবে এটিও স্মরণ করতে হবে যে, তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ থেকে যখন এর আলোচ্যসূচি ও কার্যপত্র প্রস্তুত করা হয় তখনও আমি সাবেক অতিরিক্ত সচিব হারুনুর রশিদ সাহেবের সাথে কাজ করেছি। আলোচ্যসূচী অনুযায়ী সভা পরিচালিত হবার শেষ প্রান্তে আমি প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি নিয়ে প্রসঙ্গ উত্থাপন করি যে, বাংলাদেশের প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থী আছে। ওদের প্রত্যেকের হাতে ল্যাপটপ দেয়া হবে এমন ঘোষণা আপনি দিয়েছেন। আমরা এখন সকল ডিজিটাল যন্ত্র আমদানী করি। এর ফলে যে বিপুল পরিমাণ  বৈদেশিক মুদ্রা আমাদেরকে ব্যয় করতে হয় নিজের দেশে যদি সংযোজনও করি তবে তাতে অন্তত শতকরা ২৫ ভাগ সাশ্রয় হবে। সভায় এই প্রসঙ্গে অনেক আলোচনা হয়। টেলিফোন শিল্প সংস্থার বিষয় নিয়েও কথা হয়। দোয়েলের ব্যর্থতাও আলোচনায় আসে। সভায় উপস্থিত প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা জনাব সজীব ওয়াজেদ জয়ও আলোচনায় অংশ নেন। আলোচনার ফাঁকে অন্যদের বক্তব্যের আলোকে আমি বলি যে, টেলিফোন শিল্প সংস্থাকে মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবেনা। কারণ সেটির রোগ হচ্ছে ব্যবস্থাপনার ত্রুটি। আমরা যদি আমদানীর শেকল ছিড়তে না পারি তবে আমাদের সংকট আরও বাড়বে। প্রধানমন্ত্রী আমাকে টেলিফোন শিল্প সংস্থার দায়িত্ব দেবার কথা বলে ঘোষণা করেন যে, বাংলাদেশ ডিজিটাল যন্ত্র কেবল উৎপাদন করবেনা, রপ্তানীও করবে। সভাশেষে অনানুষ্ঠানিকভাবেও তিনি বিষয়টি নিয়ে আমার এবং অর্থমন্ত্রী মহোদয়সহ অন্যদের সাথে আলোচনা করেন। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুসারে টেলিফোন শিল্প সংস্থার দায়িত্ব আমার নেয়া হয়নি। কারণ সংস্থাটি চায়নি যে আমি সেটি সার্বিকভাবে পরিচালনা করি-তারা চেয়েছে আমি বরং নামকা ওয়াস্তে  কর্মহীন উপদেষ্টা হয়ে থাকি।  উপদেষ্টার সেই পদটি আমি গ্রহণ করিনি। কারণ কাজ ছাড়া পদবী নিয়ে থাকার কোন কারণ আমি খুজে পাইনি।

প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ডিজিটাল বাংলাদেশ টাস্কফোর্সের সভার পর আমরা এর পরের বছর ২০১৬-১৭ অর্থ বছরের বাজেটে এর প্রতিফলন হবে তেমন আশা করলেও বিষয়টি নিয়ে কোন মহল থেকেই সেইভাবে সরকারকে বুঝানো হয়নি। বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের কোন বাণিজ্য সংগঠন, যেমন বিসিএস, বেসিস বা তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ কিংবা এফবিসিসিআই এই বিষয়ে কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগকে কেউ প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্মরণও করিয়ে দেয়নি। আমি আগেই বলেছি, নিজের কোন প্লাটফরম না থাকায় পত্র লিখে বিষয়টি স্মরণও করাতে পারিনি। কিন্তু ১৬ সালের ১৬ জুলাই যখন আমি বেসিস এর সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করি তখন আমার মাথায় প্রচ-ভাবে এটি কাজ করে যে শুরুতেই নিজের দেশকে বাচাতে হবে। তাই সেই নির্বাচনেই আমরা দেশীয় সফটওয়্যারের সুরক্ষার পাশাপাশি দেশে ডিজিটাল ডিভাইস উৎপাদনের জন্য সরকারকে সক্রিয় করার অঙ্গীকার ঘোষণা করি। বেসিস এর সভাপতিত্বের দেড় বছরে সংশ্লিষ্ট সকল মহলেই এটি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। বিশেষ করে সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। দেশে হার্ডওয়্যার উৎপাদন, দেশীয় সফটওয়্যারের সুরক্ষা এবং তথ্যপ্রযুক্তি রপ্তানীতে প্রণোদনার বিষয়গুলো এই বিভাগের  বাজেট অগ্রাধিকার তালিকায় গুরুত্ব পায়। এই বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জনাব জুনাইদ আহমদ পলক নিজে এই বিষয়ে দারুনভাবে আগ্রহী হয়ে ওঠেন এবং তার বিভাগকে এজন্য সকল ধরনের কাজ করতে নির্দেশ দেন। তিনি নিজেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ, সরকারের সকল স্তরে এই বিষয়ক সভায় যোগ দেন এবং ্এই খাতের বক্তব্যগুলো তুলে ধরেন।
১৭-১৮ সালের বাজেট দেখে আমরা অনুভব করলাম যে, অসম সাহসিনী নেত্রীর বিচক্ষণতা, দূরদৃষ্টি ও দেশপ্রেম এবারের বাজেটে প্রতিফলিত হয়েছে এবং এবার দেশীয় সফটওয়্যারের সুরক্ষা ও দেশটি ডিজিটাল ডিভাইস উৎপাদনে মাইলফলক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরা এখন দুনিয়াকে এই অর্জন  দেখাতে পারবো। একদিকে সরকার এবার ডিজিটাল যন্ত্রপাতি উৎপাদনের সকল কাচামাল ও যন্ত্রাংশকে মাত্র শতকরা এক ভাগ করের আওতায় রেখে খুচরা স্তরের ভ্যাটও প্রত্যাহার করে নিয়েছে। বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তির ইতিহাসে ৯৮-৯৯ সালে কর ও শুল্ক প্রত্যাহারের ঘটনাটি যেমন মাইলফলক ছিলো এবার সেটিও তেমনি একটি কাজ হলো। আমি আশা করি একটি অর্থ বছরেই এর প্রভাব আমাদের ডিজিটাল ডিভাইস উৎপাদন ও রপ্তানীতে দেখতে পাব। অন্যদিকে সরকার বিদেশী সফটওয়্যারের ওপর করারোপ করার ফলে দেশীয় সফটওয়্যারের প্রতিযোগিতার শক্তি বাড়লো।

তবে বাজেট পেশ করার পর আমাদের একটি দাবীই অনুপস্থিত দেখতে পেয়েছিলাম। সেটি হলো আমরা তথ্যপ্রযুক্তি রপ্তানীতে যে নগদ প্রণোদনার দাবি তুলেছিলাম সেটি বাজেটে ছিলোনা। বাজেট আলোচনায় আমি প্রায়ই বলছিলাম যে, আমাদের এই দাবিটি হয়তো এই বিষয়ক কমিটির সভায় আলোচিত হয়ে ইতিবাচক হবে। এই নিবন্ধে সেই গল্পটিই তুলে ধরতে চাই।এজন্য কিছুটা পেছনে ফিরে তাকাতে হবে। উল্লেখ করা দরকার যে, এই দাবি তোলারও একটি সুন্দর ও চমকপ্রদ ইতিহাস রয়েছে। আসুন এবার একটু পেছনে ফিরে তাকাই।

উনিশ অক্টোবর ২০১৭: সকাল সাড়ে দশটায় বসুন্ধরা সম্মেলন কেন্দ্রে ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড ১৬ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। বেসিস ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড এর সহ আয়োজক বিধায় অনুষ্ঠানের মঞ্চে আমারও থাকার কথা। উদ্বোধন করবেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। আগে থেকেই আমাদের প্রস্তুতি ছিলো যে, প্রধানমন্ত্রী আসার এক ঘণ্টা আগেই উদ্বোধনী স্থলে পৌছে যাব। ঘুমকাতুরে মানুষ হলেও প্রয়োজনে আমি আগেই জেগে ওঠতে পারি। সকাল সাড়ে আটটায় লালমাটিয়ার বাসা  থেকে বের হলাম। কিন্তু বিধি বাম। ঘরের দোর সাতাশ নাম্বার থেকে জ্যাম শুরু হলো। বনানী সিগন্যালে গিয়ে একদম স্থির হয়ে গেলাম। সাড়ে নটায় গাড়ি চলা বন্ধ করা হলো এবং ছাড়লো সাড়ে দশটায়। সামনের ফাকা রাস্তা ধরে আমি যখন বসুন্ধরায় পৌছাই তখন সাড়ে দশটা পার হয়ে গেছে। মূল গেট বন্ধ।  সচরাচর সেটিই হয়ে থাকে। প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করার পর আর কাউকে সেখানে প্রবেশ করতে দেয়া হয়না-বেরও হতে দেয়া হয়না।

সেদিন আমার কপাল ভাল ছিলো যে এসএসএফ এর একজন আমাকে চিনতে পেরে মূল গেটে ঢুকতে দিয়েছিলেন। এরপরও কপাল ভাল যে, এসএসএফ এর অন্য একজন চিনতে পেরে আমাকে মূল অনুষ্ঠানস্থলেও ঢুকতে দিলেন। তিনি একদম মঞ্চের পাশে একটি চেয়ার স্থির করে আমাকে যখন বসাতে যাবেন তখন অভাবনীয় ঘটনাটি ঘটলো। মঞ্চে ওঠে এল একটি সোফা এবং মঞ্চ থেকে একজন এসএসএফ কর্মী নেমে এসে আমাকে মঞ্চে ওঠিয়ে দিলেন। তখন প্রধানমন্ত্রী, তথ্য ও যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সচিব, কম্পিউটার কাউন্সিলের নির্বাহি পরিচালক মঞ্চে রয়েছেন। অনুষ্ঠানের স্বাগত ভাষণও শেষ হয়ে গেছে। এটুআই-এর কবির বিন আনোয়ার বক্তৃতা দিয়ে ফেলেছেন। বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল এর নির্বাহি পরিচালক (সাবেক) সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বক্তব্য পেশ  করে ফেলেছিলেন। আমি প্রবেশ করার সময় বক্তব্য রাখছিলেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সচিব শ্যাম সুন্দর সিকদার। আমি অতিথিদের পেছন দিয়ে যাবার সময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, দেরি কেন? আমি মাথাটা নিচু করে তার কানের কাছে মুখটা নিয়ে বললাম, আপনি আসবেন তাই বনানী ক্রসিং-এ এক ঘণ্টা গাড়ি আটকে দিয়েছিলো। খুবই দুঃখিত এই ত্রুটির জন্য। তিনি মিষ্টি করে হাসলেন। আমি মনে করি সেদিন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে অসাধারণ সম্মানটুকু আমাকে প্রদান করেন তার সাথে জীবনের আর কোন ঘটনাকে তূলনা করতে পারবনা। একজন অতি সাধারণ মানুষকে তিনি যে মর্যাদার আসনে বসিয়েছেন সেটি তার বিশালত্বকেই প্রকাশ করে। সারা জীবন তার এইটা পেয়ে আমি ধন্য হয়ে যাই। ৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে পড়ার সময় ছাত্র সংসদের নির্বাচনের সময় এমন একটি মিষ্টি হাসির কথা মনে পড়লো। সেবার আমার ভিপি পদে নির্বাচন করার কথা। সব ঠিক ঠাক। মনোনয়ন পেপারে সই করতে গিয়ে তিনি জানলেন যে আমি কয়েক মাসের বেতন দিইনি। সেজন্য তার কাছ থেকে বকা খেয়েছিলাম। তাকে তখন বাধ্য হয়ে আমার বদলে অন্য একজনকে ভিপি পদে মনোনয়ন দিতে হয়েছিলো। শেখ হাসিনার এই হাসিতে একটু বকা এবং পুরোটা আদর মিশে থাকে। সেই থেকে জীবনে বহুবার তার এই হাসি আমি দেখেছি। তিনি বরাবরই হাসিতে পুরো অনুষ্ঠান শেষ করেন। কখনও আবার একটু গম্ভীরও দেখায় তাকে। কখনও কখনও সেই হাসি প্রাণ খোলা হয়ে ওঠে। সেই হাসি মুখ দেখতে দেখতে সংকোচের সাথেই সোফাসেটে বসে অবিশ্বাস্য ঘটনাটির কথা ভাবছিলাম। আমার জানা নেই কোন প্রধানমন্ত্রীর কোন অনুষ্ঠানে এমন কোন ঘটনা এর আগে ঘটেছে কিনা।  আমি নিজে ভেবেছিলাম কোন মতে যদি আমাকে অনুষ্ঠানস্থলে ঢুকতে দেয়া হয় এবং পেছনের সারির কোথাও যদি আমাকে বসতে দেয়া হয় তবেই জীবন ধন্য হবে। সেই ভাবনার বিপরীতে এমনটা সম্মান পাব সেটি কল্পনারও বাইরের ছিলো। আমার নিজের ধারনা অনুষ্ঠানের উপস্থিত সকলের জন্য এটি তাদের জীবনের ব্যতিক্রমী ঘটনা ছিলো। 

আমি সত্যি সত্যি ঠিক জানিনা, প্রধানমন্ত্রীর কোন অনুষ্ঠানে এভাবে কেউ দেরিতে প্রবেশ করেছে কিনা, দেরিতে প্রবেশকারীকে এভাবে মঞ্চে তোলা হয়েছে কিনা এবং তাকে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দিতে বলা হয়েছে কিনা। ঘটনাচক্রে সোফায় বসার সাথে সাথেই ডাক পড়লো আমার বক্তব্য দেবার। তখন বেলা ১১-০৯ মিনিট। পডিয়ামে দাড়িয়ে দেখলাম দেশের গণ্যমান্য প্রায় সকল মানুষ সামনে বসা। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল মুহিত থেকে শুরু করে পদস্থ আমলা ও সাংসদরাও উপস্থিত। আমার বক্তব্য শুরু হতেই মুহিত ভাই-এর মুখে হাসি দেখলাম। একটু পরে প্রধানমন্ত্রী কাগজের নোট বই ও কলম হাতে নিলেন। মুখের হাসিটা আরও উজ্জ্বল হলো। বক্তব্য দেবার ফাকে ফাকে আমি বস্তুত অর্থমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর দিকেই তাকাচ্ছিলাম। আমার উদ্দেশ্যও ছিলো এই দুজনই। কথা ছিলো প্রধানমন্ত্রীর সামনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করতে হবে। বেসিস থেকে আমার  লিখিত বক্তব্যের একটি খসড়া এসএসএফকে দেয়াও হয়েছিলো। কিন্তু আমি আগেও যেমনি লিখিত বক্তব্য পাঠ করিনি সেদিনও তা করিনি। পুরোই আপন মনের মাধুরি মেশানো বক্তব্য দিলাম। যদি পুরো বক্তব্যের একটি শিরোনাম  তৈরি করতে হয় তবে তা হচ্ছে  দেশ দেশ এবং দেশভিত্তিক। 
আমি ডিজিটাল যন্ত্রপাতি আমদানীর বিপরীতে দেশে উৎপাদন ও রপ্তানীর প্রসঙ্গটি তুললাম। আমি ইন্টারনেটের কথা বললাম। আমি বললাম আমাদের ছেলে মেয়েদের দিয়ে ডিজিটাল রূপান্তরের কাজ করানোর কথা। তবে আমার সেদিনের প্রধান উপজীব্য বিষয় ছিলো তথ্যপ্রযুক্তি রপ্তানী খাতে সরকারের পক্ষ থেকে নগদ প্রণোদনা দেবার দাবি তোলা। আমি স্মরণ করতে পারি সেটি আমার জীবনের অন্যতম সেরা বক্তব্য। ১১-১৯ মিনিটে আমি বক্তব্য শেষ করলাম। ইউটিউবে পুরো অনুষ্ঠানটির রেকর্ড আছে।  সেই রেকর্ডটির লিঙ্ক হচ্ছে এরকম: www.youtube.com/watch?v=jSt2RHZDUKc।  ইউটিউবের ভিডিওটির ৩৯-২৩ মিনিটে আমার বক্তব্য শুরু করে ৪৯-২৩ মিনিটে সেটি শেষ হয়।

আমার বক্তব্যের পর প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য পেশ করার সময় আমার প্রত্যাশা অনুযায়ী আমার দাবিগুলো নিয়ে কোন কথা বললেন না। অনুষ্ঠানের শেষে তিনি যখন মঞ্চ থেকে নেমে আসেন তখন আমিও তার সাথে নামি এবং অর্থমন্ত্রীর সাথে মঞ্চের সিড়িতেই দেখা হয়। আমি তখন প্রসঙ্গগুলো তুলি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলি, এই যে আমাদের মুহিত ভাই আছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি মুহিত ভাইকে আমাদের দাবির কথা এখনই বলে দিন, তাহলে সামনের বাজেটে তিনি আমাদের সব দাবি মেনে নেবেন। প্রধানমন্ত্রী তার সেই চিরায়ত হাসিটি দিয়ে মুহিত ভাইকে আমাকে  দেখিয়ে বললেন, শুনেন উনার কথা। মুহিত ভাইও হাসলেন। আমি ঠিক বলতে পারবনা সেদিনের সেই মুহূর্তের আলোচনায় কে কি বললেন আর কে কি বুঝলেন। এরপর ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড এর এক সেমিনারে তোফায়েল ভাইকে পেয়ে যাই। তার সামনেও আমি দাবিগুলো তুলি। তিনি সেই সেমিনারে প্রকাশ্যে ঘোষণা করলেন যে, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের রপ্তানীতে সরকার শতকরা ১০ ভাগ নগদ প্রণোদনা দেবে। ২১ অক্টোবর ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড এর সমাপনী অনুষ্ঠানে অর্থ মন্ত্রীর কাছেও আমার সেই কথাগুলো তুলে ধরি। এরপর যখনই আমার সুযোগ হয়েছে তখনই আমি দেশয়ি সফটওয়্যারের সুরক্ষা, দেশে ডিজিটাল যন্ত্র উৎপাদনের ব্যবস্থা এবং রপ্তানীতে নগদ প্রণোদনার দাবি তুলেছি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাথে সভা হোক, টিভি চ্যানেলের লাইভ শো বা টক শো হোক কিংবা পত্রিকার কলাম হোক আমি প্রধানত এই তিনটি বিষয়ের মাঝেই আমার বক্তব্য সীমিত রেখেছি।

১৫ জুন ১৭: আমি আগেই জানতাম ১৫ জুন সকাল দশটায় অর্থ মন্ত্রণালয়ে রপ্তানী প্রণোদনা বিষয়ে আনন্ত মন্ত্রণালয়ের সভা হবে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমদ পলক তারিখটা আমাকে অনেক আগেই জানিয়েছিলেন। শুধু সেদিনের তারিখ স্মরণ করানো কেন, তিনি তার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে রপ্তানীতে নগদ প্রণোদনা দেবার জন্য আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবও দিয়েছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে।
আমাকেই জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, সভা অনুষ্ঠানের আগেই অর্থমন্ত্রীর সাথে আমি যেন কথা বলে নিই। তিনি নিজেও প্রস্তুতি নিয়েছিলেন সভায় যোগদানের। কদিনের প্রস্তুতির ফলাফল হিসেবে ১৪ জুন সকালে আমাকে আর সামি আহমদকে অর্থ সচিবের কাছে তিনি তার ডিও লেটার দিয়ে পাঠান। ডিও লেটারটি তিনি ১৩ জুন সই করেন যার নাম্বার হচ্ছে আধা-সরকারি পত্র সংখ্যা ৫৬০০০০০০০০৬৯৯০০৩১৭-৫৭৪ তারিখ ১৩ জুন ২০১৭। পত্রে তিনি নগদ সহায়তা প্রদানের যৌক্তিকতা তুলে ধরে শতকরা ২০ ভাগ প্রণোদনা প্রদানের অনুরোধ করেন। তিনি পত্রে ২১ সাল নাগাদ ৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানীর লক্ষ্যমাত্রার কথাও উল্লেখ করেন।

আমি এবং সামি আহমদ ১৪ জুন ১৭ সকালে সেই পত্রটি নিয়ে অর্থ সচিব হেদায়েত আল মামুন এর সাথে দেখা করে কথা বলি এবং তিনি আমাদের জন্য শুভ কামনা প্রকাশ করেন। একই সাথে তিনি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন যে, প্রকৃতপক্ষে মাননীয় অর্থমন্ত্রীই এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। কয়েক মিনিটের আলোচনায় আমরা সচিব মহোদয়কে কিছুটা ইতিবাচক দেখে আশান্বিত হলাম। চাইছিলাম এই সুযোগে অর্থমন্ত্রীর সাথেও দেখাটা করে যাই। তবে খোজ নিয়ে জানা গেল যে, অর্থ মন্ত্রী তখনও অফিসে আসেননি। ফলে সেদিনই সিদ্ধান্ত নেয়া হলো যে, পরের দিন দশটায় সভা শুরু হলেও অন্তত এক ঘণ্টা আগে এসে আমরা অর্থমন্ত্রীর সাথে এই বিষয়ে আমাদের প্রস্তাবনা পেশ করব।  

সেদিন সকাল পর্যন্ত আমি জানতাম যে সভায় জুনাইদ আহমদ পলক থাকবেন।  আমার সাথে সামি আহমদও থাকার কথা।  কিন্তু সেদিন সকালে সামি আহমদ জানালেন যে, প্রতিমন্ত্রী মহোদয় থাকতে পারবেন না।  সামিও আসতে পারবেন না। বিষয়টি পরে টের পেয়েছিলাম যখন সভা চলাকালে তাতে আমাকেও থাকতে দেয়া হয়নি।  সকাল সাড়ে নটায় আমি অর্থমন্ত্রীর সাবেক একান্ত সচিব জাকারিয়া সাহেবের রুমে বসে অনুভব করলাম যে আজকের লড়াইটা আমার একারই।  জাকারিয়া সাহেব জানতেন, আমি মাননীয় অর্থ মন্ত্রীর সাথে সভার আগে এক মিনিট কথা বলতে চাই। তিনি বারবার খোজ নিচ্ছিলেন মুহিত ভাই কখন আসবেন।  কিন্তু হঠাৎ জানলাম সকাল ঠিক দশটায় মাননীয় অর্থমন্ত্রী সরাসরি সভাকক্ষে ঢুকে পড়লেন। নিজের রুমে গেলেনইনা।  আমিও তাই সরাসরি সভাকক্ষে ঢুকে গেলাম।  সালাম দিলাম মুহিত ভাইকে।  মুহিত ভাই মিষ্টি করে হাসলেন। বললেন  “আজকেতো তোমার এজেন্ডা আছে”। “জ্বী, আপনার বিবেচনার অপেক্ষায় আজকের মাইলফলক প্রস্তাবনা আমাদের রপ্তানীতে নগদ সহায়তা দেবার জন্য।” কথাগুলো বলে আমি সভাকক্ষের শেষের দিকে একটি চেয়ার টেনে বসলাম। দেখে নিলাম নিজের সামনে মাইক্রোফোন রয়েছে কিনা। তাকিয়ে দেখলাম পাশের সবাই অচেনা।  মিনিট দুয়েক পরে কেউ একজন আমার কাছে এসে বললেন, আপনি কি এই সভায় এসেছেন? আমি হ্যা বলার পর তিনি জানালেন, আমি আমন্ত্রিত নই-তাই এই সভাতে উপস্থিত থাকতে পারবনা।  আমি তাকে জানালাম, আমার বিষয়ে এজেন্ডা আছেতো। তবুও তিনি জানালেন যে আমার থাকা সম্ভব না। বাধ্য হয়েই বললাম, বেশ থাকবনা, এখনই বের হয়ে যাচ্ছি।  বেরোনোর  সময় সভাপতির আসনে বসা মুহিত ভাই এর কাছে গিয়ে হেসে বললাম, আজ কিন্তু আমাকে নগদ প্রণোদনা দেবার কথা।  তিনি হাসতে হাসতে বললেন, আর কতো দেব তোমাকে। সেই যে ২০০৯ সাল থেকে নিচ্ছ-নিয়েই যাচ্ছ। তোমাদের  ২০২৪ সাল পর্যন্ত আয়কর নাই।  আমার সরকারতো বটেই পরের সরকারের জন্যও তোমাদের আয়কর মাফ করে দিছি। সকল ভ্যাট তুলে দিলাম। তোমার সব দাবিতো মেনে নিছি।  তোমার যন্ত্রাংশ আর কাচামালকে শুল্কমুক্ত ও ভ্যাটমুক্ত করে দিলাম।  বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক তোমার সব সমস্যার সমাধান করে পাচটা এসআরও জারি করেছে।  জুলাইতে তোমার ইইএফ ফান্ড পেয়ে যাবা।  আর কি?  আমি নিজে নিজে স্মরণ করলাম-তিনি সত্য কথাই বলেছেন। ২০০৯ সালেই ১০০ কোটি টাকার থোক বরাদ্দ দিয়ে তিনি তার ইতিবাচক কাজের সূচনা করেছিলেন। এখনও সেটি অব্যাহত রয়েছে। তার প্রতিটি বাজেট আমাদের জন্য সহায়ক ছিলো।

অর্থমন্ত্রী মুহিত সাহেবের বক্তব্যের সূত্র ধরে আমি বললাম, সবই পেয়েছি মুহিত ভাই, সব দিয়েছেন-দিচ্ছেন, তবুও রপ্তানী প্রণোদনাও দিতে হবে। এটি আমাদের অধিকার।  তিনি অর্থ সচিব ও অন্যান্য কর্মকর্তাদেরকে দেখিয়ে বললেন, দেখি ওরা কি বলে? আমিতো সব সময়েই তোমার পক্ষের কথাই বলি।  মুহিত ভাই এর একথা শোনার পর সালাম দিয়ে মিটিং রুম থেকে বের হয়ে গেলাম।  একবার ভাবলাম, মুহিত ভাই এর পিএস (তখনকার) জাকারিয়া সাহেবের রুমে গিয়ে বসি।  কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো, বাণিজ্য মন্ত্রী তোফায়েল ভাইতো আসেননি।  তিনিতো এই বারান্দা দিয়েই মিটিং রুমে ঢুকবেন।  তাকেও একটা সালাম দিতে হবে। তাকে তার প্রতিশ্রুতির কথা মনে করিয়ে দিতে হবে।  প্রায় ২০ মিনিট পর লিফট দিয়ে তোফায়েল ভাই ওঠে এলেন।  আমাকে দেখেই হাসলেন।  বললেন, কি ভাই জব্বার, আজকে আপনার এজে-া।  আমি জ্বী বলে পাশাপাশি হাটতে থাকলাম।  কিছু না বলে তিনি কেবল আস্থাসূচক একটা হাসি দিয়ে সভায় ঢুকে গেলেন।  আমার তখন প্রচ- টেনসন।  বরাবর মুহিত ভাই আমার প্রস্তাবে সরাসরি হ্যা বলেন। যেটি পারবেন না সেটিতে না বলেন।  কোন প্রস্তাব দিলে সেটি নিয়ে মাঝামাঝি কোন কথা বলেন না।  যেটি বাদ পড়ার সেটিকে বাদ দেন।  রপ্তানী প্রণোদনা নিয়ে আমি আগে যতোবারই কথা বলেছি মুহিত ভাই প্রকাশ্যে সেই কথাই বলে আসছিলেন যে, আইসিটি অনেক কিছু পায়-আর কতো? তাদেরকে আর কতো দেয়া হবে? আমি শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। আমি স্মরণ করতে পারছিলাম যে তিনি টিভিতে লাইভ অনুষ্ঠানেও সরাসরি নাকচ করেছেন।

নগদ সহায়তা বিষয়ক আন্ত মন্ত্রণালয়  সভায় যখন থাকতে পারিনি তখন একবার ভেবেছিলাম বারান্দায় পায়চারি করে লাভটা কি? ভেতরে যে সিদ্ধান্ত হবার তাতো হবেই।  উপরন্তু কেউতো আমাকে থাকতেও বলেনি। আমার নিজের থাকার কোন প্রয়োজন আছে কিনা সেটিও জানিনা। যদি আমার প্রয়োজনই থাকতো তবে অর্থ মন্ত্রী বা বাণিজ্য মন্ত্রী আমাকে সভায় থাকতে দিতেন বা বলতেন তুমি অপেক্ষা কর। তারা কেউ কিছুই বলেননি। 

এতোটা নেতিবাচক ভাবনার পরও  সভাস্থল ছেড়ে চলে আসার কোন ইচ্ছাই জাগ্রত করতে পারলাম না। নিজের কাছে মনে হলো অন্তত জেনে যেতে হবে যে, আমার পক্ষে সিদ্ধান্ত হলো না বিপক্ষে সিদ্ধান্ত হলো। অক্টোবর থেকে লাগাতার পরিশ্রম করে যে কাজটি গুছিয়ে আনলাম সেটি তীরে এসে তরী ডুবে যাক তা হতে দেয়া যায়না। আবার এটিও ভাবলাম-যদি কথাও্ বলতে না পারি তবে আমার পক্ষের যুক্তিটা সভায় উপস্থাপিত হবে কেমন করে।

সভাকক্ষের সামনের বারান্দার কয়েক গজ জায়গা তখন আমার পায়চারির জায়গা হয়ে ওঠলো।  মনে মনে কষ্ট পাচ্ছিলাম এজন্য যে, আমি এমন চূড়ান্ত একটি সভায়  যৌক্তিক বিষয়গুলো তুলে ধরতে না পারলে আজ হেরে যাব। স্মরণ করছিলাম ৯৭ সালের কথা যখন তোফায়েল ভাই জেআরসি কমিটি গঠন করেছিলেন। তার কাছে সেই কমিটির সুপারিশ পেশ করার সময় বিণা প্রশ্নে হাসিমুখে তিনি সেটি গ্রহণ করেন। সেই বছরের ডিসেম্বরের সেমিনারটির কথাও  মনে করতে পারছিলাম। মনে পড়ছিলো শাহ এএমএস কিবরিয়ার কথা। স্মরণ করছিলাম তোফায়েল ভাই কি আন্তরিকতার সাথে আমাদের ৪৫টি সুপারিশকে গ্রহণ করেছিলেন এবং ২০০১ এর মাঝে ২৮টি সুপারিশ বাস্তবায়ন করেছিলেন। কম্পিউটারকে শুল্ক ও ভ্যাটমুক্ত করার পাশাপাশি মানবসম্পদ তৈরির দিকে মনযোগী হবার কথাটাও ভুলতে পারিনা। অন্যদিকে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত ২০০৯ সাল থেকে তথ্যপ্রযুক্তিকে যেভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন তার কোন তূলনা আমি কোনভাবেই পাবনা। আমি মনে করিনা বাংলাদেশ তথ্যপ্রযুক্তি বান্ধব এমন আর একজন অর্থমন্ত্রী পাবে। এর আগের বছর বাজেট পাসের আগের দিন তিনি ই-কমার্স এর ভ্যাট তুলে নিয়েছিলেন।

তোফায়েল ভাই বরাবরই আমাদের বিষয়গুলোকে ইতিবাচকভাবে দেখেন সেটি আমার একটি ভরসাস্থল বলে মনে হলো।  এগারোটা বাজার একটু আগে একজন সরকারি কর্মকর্তা আমাকে ডাকলেন-আপনাকে ভেতরে ডাকছে।  প্রথমেই মুহিত ভাই-এর দিকে তাকালাম।  তিনি তখন বেশ বড় করেই হাসলেন।  সাহস পেলাম অনেক।  তোফায়েল ভাইও হাসলেন।  সবাইকে সালাম দিয়ে বসার পর তোফায়েল ভাই বললেন, বলুন আপনার রপ্তানী প্রণোদনার যুক্তি কি? আমি প্রথমেই দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম এই বলে যে এটি আমার অধিকার।  সরকার সকল রপ্তানী খাতে প্রণোদনা দেবে আর আমাকে কেন দেবেনা।  আমি যে কোন রপ্তানী খাতের চাইতে বেশি মূল্য সংযোজন করি।  অন্যরা বস্তুগত পণ্য রপ্তানী করে আর আমি মেধা রপ্তানী করি।  আমার মূল্য সংযোজন শতভাগ। সরকার পোশাকরপ্তানী থেকে যদি ৫০ বিলিয়ন ডলার পায় তবে সম পরিমাণ সুবিধা আমার ৫ বিলিয়ন ডলারেই পায়। আমি কোন বস্তুগত সম্পদ আমদানী করিনা। উপরন্তু আমি শিক্ষিত বেকারদের কর্মসংস্থান করি।  আমার কাছে এটি অর্থনৈতিক বিষয় নয়, মানসিক শক্তি অর্জনের বিষয়।  এর মানে হবে সরকার যে আমাদের সাথে আরও জোর দিয়ে আছে সেটি নিজেকে ও বিশ্ববাসীকে জানানো সম্ভব হবে। সরকার এই খাতকে ব্যাপকভাবে সহায়তা করে আসছে বলেই আমরা এতোটা পথ এলাম।   অন্যরা ভাববে এই সরকার প্রযুক্তিবান্ধব। আমি এর মধ্য দিয়ে প্রতিযোগিতার বাজারেও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারব।

সেই ৯৭ সালের  তোফায়েল ভাই এর গঠন করা জে আরসি কমিটি, ৯৮-৯৯ সালের শুল্ক ও ভ্যাট মুক্ত করন, ২০০৮ সালের ডিজিটাল বাংলাদেশ ঘোষণা এবং ২০০৯ সাল থেকে অব্যাহত সমর্থন আমাদেরকে অনেকটা পথ সামনে এনেছে।  আমরা ২০০৮ সালের ২৬ মিলিয়ন ডলার রপ্তানী থেকে ১৬ সালে ৭০০ মিলিয়নে পৌছেছি।  এই প্রণোদনা আমাদেরকে মানসিকভাবে আরও শক্ত করবে।” আমার বক্তব্যের পরও কোন কোন কর্মকর্তা এই প্রণোদনার বিষয়ে কিছুটা শঙ্কা প্রকাশ করলেন। কিন্তু সভার প্রায় সবাই এই বিষয়ে একমত হলেন যে, তথ্যপ্রযুক্তির জন্য এই প্রণোদনা দেয়া উচিত।  আমি আনন্দিত হলাম সভার সুর ইতিবাচক দেখে।  অর্থ মন্ত্রী, অর্থ সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান, বাণিজ্য মন্ত্রী সবাই বললেন, হ্যা, নগদ প্রণোদনা দিতে হবে।  তবে তারা প্রশ্ন তুললেন, এর যেন অপব্যবহার না হয়।  আমি দায়িত্ব নিয়ে বললাম, সেটি আমার ওপর ছাড়বেন।  ব্যর্থ হলে আমাকে ফাসিতে লটকাবেন।  খুশি হলাম এটি দেখে যে সবাই আমার কথার ওপর আস্থা রাখলেন। এই আলোচনার ফলে বেসিস তার নিজের প্রাধান্য গড়ে তুলতে সক্ষম হলো। প্রণোদনা দেবার ব্যাপারে বেসিস এর ভূমিকা নিশ্চিত হলো।

কতো ভাগ প্রণোদনা দেয়া হবে সেটিতে প্রথম শতকরা ৫ ভাগ প্রস্তাব এলো। বলা হলো, শতকরা ৫ ভাগ দিয়ে শুরু করা হোক। কিন্তু আমি বললাম যে, প্রণোদনা ৫ ভাগ দিলে সেটি কারও মনেই কোন আচড়ই কাটবেনা। আমি অন্তত ১০ ভাগের দাবিতে অনঢ় থাকলাম।  তখন সর্বসম্মতিক্রমে ১০ ভাগই অনুমোদিত হলো। এরপর প্রশ্ন এলো কিসের ওপর এই প্রণোদনা দেয়া হবে। আমি খুব স্পষ্ট করে বললাম, এটি কম্পিউটারের সফটওয়্যার, তথ্যপ্রযুক্তি সেবা এবং ডিজিটাল যন্ত্রসহ সকল রপ্তানীর ক্ষেত্রেই দিতে হবে। ডিজিটাল যন্ত্র প্রসঙ্গে একটু গলাটান শুনে আমি জানালাম-এটির রপ্তানীতে সহায়তা করা বরং সহজ হবে, কারণ তাতে আমরা সহজে সনাক্ত করার সুযোগ পাব। অন্যদিকে আমরা দেখবো যে, বিশ্বের বড় বড় ডিজিটাল যন্ত্র উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন করবে এবং এখান থেকে পণ্য রপ্তানী করবে।  তোফায়েল ভাই নগদ প্রণোদনার অপব্যবহার সম্পর্কে আমাকে মনে করিয়ে দিলেন যে, এর আগে জামদানীতে নগদ প্রণোদনা দেয়া হয়েছিলো-কিন্তু অপব্যবহার হওয়ায় সেটি বাতিল করা হয়েছে। আমি সভাকক্ষের সকলের চোখে মুখে আনন্দ দেখে অভিভূত হলাম।  এরপর অর্থ মন্ত্রী আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমিতো খুশি। সব পেয়ে গেছ।  তবে প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার আগে একথা প্রকাশ করতে পারবেনা। তোফায়েল ভাই জানালেন, ২৮ জুন ১৭ প্রধানমন্ত্রী সংসদে ভাষণ দেবেন এবং তার ঘোষণার পরই সেটি যেন সবাই জানে।  আমি সম্মতি দিয়ে অনুরোধ করলাম, ঘোষণা না হয় পরে হবে। কিন্তু এই সভাটি ইতিহাসের একটি অংশ। অনুমতি পেলে আমি এর একটা ছবি তুলে রাখি।  অর্থমন্ত্রী সম্মতি দিলেন।  আমিও ছবি তোললাম। 

২৮ জুন প্রধানমন্ত্রী ও অর্থ মন্ত্রী  বাজেট ভাষণ প্রদান করেন এবং ২৯ জুন সেই বাজেট পাসও হয়। প্রণোদনার বিষয়টি বাজেট আলোচনায় না আসায় আমি অর্থমন্ত্রী ও অর্থ সচিব এর সাথে কথা বলে জানতে পারি যে, এটি বাজেটে প্রকাশ করতে হবেনা। বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক এই বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করবে। বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক সেই প্রজ্ঞাপন জারীও করেছে।১লা জুলাই ১৭ থেকে বহাল হওয়া এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তির ইতিহাসে এমন একটি ঘটনা যাকে আমি ৯৮-৯৯ সালে কম্পিউটারের ওপর থেকে শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহার করার চাইতেও অনেক গরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করি। এটি বাংলাদেশ থেকে মেধাসম্পদ ও ডিজিটাল যন্ত্র রপ্তানীর এমন এক দিগন্ত উন্মোচন করবে যা এর আগে আমরা কখনোই ভাবতেও পারিনি। একই সাথে এই কথাটিও বলা দরকার যে টাস্কফোর্স ও ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড এর আবেদন অনুসারে এবারের বাজেটে ডিজিটাল যন্ত্রের স্থানীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করার জন্য শুল্ক কাঠামোতে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।এবারের বাজেটটাই বস্তুত তথ্যপ্রযুক্তির। এবার একদিকে দেশীয় সফটওয়্যার ও সেবাখাতকে সুরক্ষা দেয়া হয়েছে। এই বাজেট ডিজিটাল যন্ত্র উৎপাদনকে সুরক্ষা দিয়েছে এবং দিয়েছে রপ্তানীতে প্রণোদনা। বিজয় হচ্ছে ডিজিটাল বাংলাদেশ এর।

বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিকাশের কথা যারা জানেন তারা এই মাইলফলক সিদ্ধান্তে আরও নিশ্চিত হবেন যে এই সরকার কেবল তথ্যপ্রযুক্তিবান্ধব নয় তারা সামনের দিকেও তাকাতে পারেন। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে এরই মাঝে সরকার আনুষ্ঠাানিকভাবে তথ্যপ্রযুক্তি রপ্তানী সহায়তা বিষয়ক প্রজ্ঞাপন জারী করেছে এবং দেশের অনেকগুলো শিল্প প্রতিষ্ঠান দেশে ডিজিটাল যন্ত্র উৎপাদনে উদ্যোগ নিয়েছে। আমি মনে করি আমরা প্রধানমন্ত্রীর সেই স্বপ্নটা-“আমরা কম্পিউটার বানাবো এবং রপ্তানী ও করবো।” নিবন্ধ লেখার সময় অক্টোবর ১৭ এর অবস্থা হচ্ছে যে ওালটন, সিম্ফনি এবং উই দেশে মোবাইল ফোন উৎপাদনের কাজ শুরু করেছে। ওয়ালটন ডিসেম্বর থেকে কম্পিউটারও বানাবে। কোন কোন প্রতিষ্ঠান স্মার্ট টিভি, আইওটি ফ্রিজ বানানো শুরু করেছে। আমাদের প্রত্যাশা সহসাই এগুলো রপ্তানীও হবে। এর ফলে ৬ আগস্ট ১৫ এ প্রধানমন্ত্রী যে স্বপ্নটা দেখিয়েছিরৈন সেটি বাস্তবায়িত হতে শুরু করেছে।
২০১৭-১৮ সালের বাজেটে সরকার ডিজিটাল যন্ত্র উৎপাদনের এবং দেশয়ি সফটওয়্যার সুরক্ষায় শুল্ককাঠামোতে যেসব যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার সাথে রপ্তানী প্রণোদনার বিষয়টি যুক্ত হবার ফলে একদম ছোট ছোট আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠান থেকে বড় বড় রপ্তানী প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত ব্যাপকভাবে সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারবে। এর ফলে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো মেধাস্বত্ত্বে রপ্তানী প্রণোদনা প্রদানের নতুন মহাসড়কের উদ্বোধন করলো। আমি নিজে আত্মবিশ্বাসী যে এটি আমাদের ভবিষ্যৎ গড়বে, গড়বে আমাদের ডিজিটাল বাংলাদেশ। রপ্তানীতে যে নেতিবাচক অবস্থাটি বিরাজ করছে তাকে ইতিবাচক করার ক্ষেত্রেও এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
রপ্তানী সহায়তার বিষয়টি এখন চূড়ান্ত রূপ নিচ্ছে। সরকার এটি ঘোষণা করার পর কিভাবে এই সহায়তা দেয়া হবে তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। বেসিসকে সফটওয়্যারের জন্য এবং বেসিস ও বাকো কে আইটিইএস এর জন্য  মনিটরিং এর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এছাড়াও কম্পিউটার সমিতিকে কম্পিউটার ও ডিজিটাল যন্ত্রপাতির জন্য দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে। এখন কেবল সামনে যাবার পালা। সর্বশেষ তথ্য অনুসারে বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক এরই মাঝে এই বিষয়ক এসআরও জারি করেছে। কিছু প্রতিষ্ঠান রপ্তানী সহায়তা পাবার জন্য আবেদন করার প্রস্তুতিও নিচ্ছে। অন্যদিকে ওয়ালটন এরই মাঝে বাংলাদেশের প্রথম কম্পিউটার উৎপাদন কারখানার উদ্বোধন করেছে। আরও কিছু প্রতিষ্ঠান দেশে ডিজিটাল যন্ত্র উৎপাদনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।

ঢাকা, ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৮ ॥ লেখক তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, কলামিস্ট, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাস-এর চেয়ারম্যান- সাংবাদিক, বিজয় কীবোর্ড ও সফটওয়্যার-এর জনক ॥ ই-মেইল: mustafajabbar@gmail.com, ওয়েবপেজ: www.bijoyekushe.net, www.bijoydigital.com

Latest at BASIS

BASIS EC Meets & Greets Honorable Prime Minister Sheikh Hasina

BASIS EC (2018-20) has met with Hon'ble Prime Minister Sheikh Hasina. On 15 January, 2019 BASIS EC has congratulated..

DETAILS

NEWS     

BASIS President has become FBCCI Director

The APEX ICT Trade Body of Bangladesh, BASIS President Syed Almas Kabir has become a Director of Federation of Bangladesh.

[Read More]

PHOTO GALLERY

See All

BDBL Bhaban (Level 5 - West),
12 Kawran Bazar, Dhaka -1215
Phone: +880 96 12322747,
+880 2 550 121 55;
Fax: +880 2 8144709

Email: info@basis.org.bd

Follow Us


Like and share with us in facebook
Follow us in twitter
Follow us in linkedin
Watch us on youtube
BASIS is ISO 9001:2015 Certified!
Copyright © BASIS. All rights reserved. | V-1 | Design by Magnito Digital Ltd | Developed & Maintained by Systech Digital Limited